হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণাঃ বিস্তারিত জানুন

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে অনেকেই জানতে চান বা তাদের ধারনা পরিস্কার করার জন্য তথ্য অনুসন্ধান করেন। আপনিও হয়ত মনে মনে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে জানতে চান। কিন্তু মনঃপুত কোনো তথ্য কারো কাছে পাচ্ছেন না। হ্যাঁ, এই আর্টিকেলে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। 

হোমিওপ্যাথি-কি-উপকারিতা-ব্যবহার-ভুল-ধারণা

অনেকেই দীর্ঘদিনের সমস্যা বা ছোটখাটো অসুস্থতায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উপর ভরসা করেন। তবে হোমিওপ্যাথি নিয়ে যেমন ইতিবাচক অভিজ্ঞতা আছে, তেমনি রয়েছে বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা। এই লেখায় হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে বাস্তব ও পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।সম্পূর্ণ আর্টিকেলটা পড়ুন। জেনে নিন হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে আপনার মনের গোপন জিজ্ঞাসা।

পেজ সূচীপত্রঃ হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করার আগে মানুষের চিকিৎসা পদ্ধতির বর্তমান আগ্রহের দিক সম্পর্কে জানা দরকার। বর্তমান সময়ে মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। সেই প্রেক্ষাপটে হোমিওপ্যাথি একটি বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা। অনেকেই হোমিওপ্যাথির উপকারিতা সম্পর্কে জানেন, আবার অনেকে ভুল ধারণার কারণে এটি এড়িয়ে চলেন।

হোমিওপ্যাথি শব্দটি দুটি গ্রীক শব্দ হোমিওস অর্থাৎ একই এবং প্যাথোস অর্থ রোগ থেকে উদ্ভূত। হোমিওপ্যাথি হলো একটি প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি যা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে রোগ নিরাময় করে। এই চিকিৎসা পদ্ধতি ১৮১০ সালে জার্মান চিকিৎসক ডাঃ স্যামুয়েল হানিম্যান কর্তৃক তার লিখিত যুগান্তকারী বই অর্গানন অব মেডিসিন-এ লিখিত হয়েছিল। হোমিওপ্যাথি প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করে, যা মানুষের শরীরকে ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। হোমিওপ্যাথির মূল ধারণা হলো “Like cures like” অর্থাৎ যেটা রোগ সৃষ্টি করে, তার সুক্ষ্ম মাত্রা রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে।

আরও পড়ুনঃ হোমিওপ্যাথির উপকারিতা

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সাধারণত উদ্ভিদ, খনিজ বা প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি হয় এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত পাতলা অবস্থায় ব্যবহার করা হয়। হোমিওপ্যাথির সুবিধা, ব্যবহার এবং প্রয়োগ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা নিচে করা হলো।

হোমিওপ্যাথির মূলনীতিসমূহ

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে জানতে হলে এটি কোন্ কোন্ মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত তা’ জানা প্রয়োজন। আসলে এই চিকিৎসা পদ্ধতি কয়েকটি বিশেষ নীতির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেমন-

- Like Cures Like (সমজাতীয় দ্বারা সমজাতীয় নিরাময়)
- ক্ষুদ্র মাত্রায় ওষুধ ব্যবহার
- রোগ নয় রোগীকে অগ্রাধিকার
- শারিরীক ও মানসিক উপসর্গ একত্রে বিশ্লেষণ

হোমিওপ্যাথিতে একটি রোগের জন্য সবার ওষুধ এক হয় না। একজন রোগীর জীবনযাপন, মানসিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক লক্ষণ—সবকিছু মিলিয়ে ওষুধ নির্বাচন করা হয়।হোমিওপ্যাথি বুঝতে হলে এর মূলনীতিগুলো তাই অনুসরণ করা প্রয়োজন। অনুসরণযোগ্য মূলনীতিসমূহ হলো-

* সমজাতীয়/সদৃশ মাত্রার নীতি
* ক্ষুত্রমাত্রার নীতি/অসীম মাত্রার নীতি
* একক ওষুধ নীতি
* ব্যক্তিভেদে চিকিৎসা
* স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জাগ্রত করা

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সরাসরি রোগ দমন করার বদলে শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে বলে ধারণা করা হয়। এই কারণে অনেক সময় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ধীরে ফল আসে, তবে নিয়ম মেনে চললে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী উপকার পাওয়া যায়।

হোমিওপ্যাথির বৈজ্ঞানিক দিক

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে বহু মানুষের বহু-জিজ্ঞাসার জবাব দিতে হলে আপনাকে জানতে হবে হোমিওপ্যাথির বৈজ্ঞানিক দিক সম্পর্কে। আপনি যদি মূল তত্ত্ব না-জানেন এবং মানুষের কথায় বিশ্বাস করেন তবে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে ব্যর্থ হবেন। তাই হোমিওপ্যাথির বৈজ্ঞানিক দিক সম্পর্কে এই আর্টিকেলে জানানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

অনেকে বলে থাকেন হোমিওপ্যাথিতে বিজ্ঞান নেই। কেমলমাত্র প্লাসিবো ইফেক্ট। প্লাসিবো আবার কি? হ্যাঁ, প্লাসিবো হচ্ছে সেই নকল (ডামি) ওষুধ, ইনজেকশন যা দেখতে আসলের মতই বা যার চিকিৎসা পদ্ধতি আসলের মতই কিন্তু কার্যকরী নিরাময় ক্ষমতা নেই। অর্থাৎ কোনো ওষুধ নয়, শুধু আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে নিরাময় করে থাকে। হোমিওপ্যাথি মানুষের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে কাজ করে থাকে-অনেকের এই ধারনা মনে বিদ্যমান রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ হোমিওপ্যাথির সাধারণ ব্যবহার

তবে হোমিওপ্যাথি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা হোমিওপ্যাথি ব্যবহারের ফলে শুধুই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে রোগী সুস্থ হয় একথা মানতে নারাজ। তাদের মতে, হোমিওপ্যাথের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসল সত্যকে মিথ্যার আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষ যদি চিকিৎসা পদ্ধতি দ্বারা সুস্থই না হবে তবে বছরের পর বছর কিভাবে একটি পদ্ধতি টিকে রয়েছে। জার্মানীর মতো দেশে এর উৎপত্তি ও ব্যাপক ব্যবহারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স,, ব্রাজিল সহ এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশে হোমিওপ্যাথের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এসব দেশে বিপুল পরিমাণ ওষুধও তৈরী হচ্ছে। এসব দেশ সহ বিভিন্ন দেশের গবেষকগণ তাদের গবেষণার ফলাফল দিয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন এই বলে যে, হোমিওপ্যাথি কোনো মিথ নয়। এটি স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি যথার্থ বিকল্প ভাবনা। কারণ-

- হোমিওপ্যাথি সৃজনশীল চিকিৎসা পদ্ধতি, এটি আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে।
- হোমিওপ্যাথিতে প্রতিক্রিয়াশীল ওষুধ ব্যবহৃত হয়, যার কারণে রোগের উপসর্গ নয়, রোগের কারণ নিরাময় হয়।
- হোমিওপ্যাথি কম মাত্রায়ও কার্যকর, এটি কম মাত্রায় ব্যবহার করে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে।

হোমিওপ্যাথির উপকারিতা

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনার এ’ পর্যায়ে হোমিওপ্যাথির উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। দীর্ঘদিনের পুরাতন এই পদ্ধতির নানা উপকারিতা রয়েছে। তাই এটি জনপ্রিয়।

  • পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কমঃ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম। কারণ- 
         # ব্যবহৃত ওষুধসমূহ প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রস্তুত
         # কেমিক্যাল ডোজ অত্যন্ত কম
         # দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির আশঙ্কা কম
  • দীর্ঘমেয়াদী রোগে কার্যকরঃ যে সকল রোগ মানুষের শরীরে দীর্ঘদিনের জন্য বাসা বাঁধে সে সকল রোগ নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি কার্যকরী। রোগগুলির মধ্যে রয়েছে-
        # গ্যাষ্ট্রিক
        # হাঁপানি
        # চর্মরোগ
        # এলার্জি
        # আর্থ্রাইটিস
  • শিশু ও বয়স্কদের জন্য নিরাপদঃ হোমিওপ্যাথের চিকিৎসা বা ওষুধ শিশুদের জন্য যেমন সহজে খাওয়ানো যায়, তেমনি বয়স্কদের জন্যও নিরাপদ। সদ্যজাত শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, মহিলা সবার জন্য এটি প্রয়োগযোগ্য।
  • মানসিক সমস্যায় উপকারীঃ নানা রকম মানসিক সমস্যায় আমরা প্রতিনিয়ত ভুগে থাকি। এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে যদি হোমিওপ্যাথি ওষুধ গ্রহন করা হয় তবে তা’ জটিল মানসিক সমস্যা যেমন-অনিদ্রা, উদ্বেগ, হতাশা, ডিপ্রেশন, মানসিক চাপ ইত্যাদি চিরতরে নিরাময় করা সম্ভব।
  • রোগের মূল কারণ নিরাময়ে সহায়কঃ আগেই বলেছি হোমিওপ্যাথি উপসর্গ নয়, রোগের কারণ নির্মূলে কাজ করে থাকে। অনেকে উপসর্গ দেখে শুধু উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ দেন, কিন্তু হোমিওপ্যাথে উপসর্গ ঘটার কারণ উদ্ঘাটন করে সেটা নিরাময়ে ওষুধ প্রদান করা হয়। যা অনেক কার্যকর।
  • আসক্তির ঝুঁকি নেইঃ হোমিওপ্যাথির ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে খাওয়া হলেও আসুক্তর ঝুঁকি নেই। কারণ এতে কোনো স্টেরয়েড উপাদান থাকে না।

হোমিওপ্যাথির সাধারণ ব্যবহার

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনার এ’ পর্যায়ে আলোচনা করব সাধারনতঃ হোমিওপ্যাথ কোন কোন রোগের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সাধারণভাবে হোমিওপ্যাথ নিম্নোক্ত বিভিন্ন রোগের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। হোমিওপ্যাথির নিম্নোক্ত সাধারণ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
  • সর্দি-কাশি এবং শীতজ্বরের চিকিৎসা: হোমিওপ্যাথিক ওষুধ প্রাকৃতিকভাবে শ্বাসনালীকে শক্তিশালী করে এবং ঠান্ডা লাঘব করে।
  • হজম সমস্যার সমাধান: গ্যাস্ট্রিক, বদহজম, পেটফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অ্যাসিডিটি ইত্যাদিতে হোমিওপ্যাথি প্রাকৃতিক উপায়ে সাহায্য করে।
  • ত্বকের রোগ: একজিমা, ফাঙ্গাল সংক্রমণ, ফুসকুড়ি, ব্রণ, চুলপড়া ইত্যাদির জন্য হোমিওপ্যাথি নিরাপদ ও কার্যকর।
  • মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানো: হোমিওপ্যাথিক ওষুধ মনকে শান্ত রাখে এবং ঘুমের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে।
  • প্রদাহজনিত রোগ: আর্থ্রাইটিস, গাঁটে ব্যথা বা বিভিন্ন প্রদাহজনিত সমস্যা হোমিওপ্যাথি দিয়ে উপশম করা যায়।
  • শ্বাসতন্ত্রের রোগ: হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি রোগে হোমিওপ্যাথ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

হোমিওপ্যাথির প্রয়োগ ক্ষেত্র

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনার এ’ পর্যায়ে আমরা আলোচনা করব কোন কোন ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথ চিকিৎসা বা ওষুধ প্রয়োগ করা হলে ভালো ফল পাওয়া যায় সে সম্পর্কে। নীচে এ’ ধরণের কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হলো

আরও পড়ুনঃ হোমিওপ্যাথি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

  • শিশু ও নবজাতকের যত্ন: হোমিওপ্যাথি শিশুর সর্দি, জ্বর এবং হজম সমস্যায় কার্যকর।
  • বৃদ্ধ ও বয়স্কদের জন্য: বৃদ্ধদের জয়েন্ট সমস্যা, ঘুমের অসুবিধা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
  • মানসিক সুস্থতা: উদ্বেগ, হতাশা, মনোরোগ এবং মানসিক চাপ কমাতে হোমিওপ্যাথি সহায়ক।
  • দীর্ঘমেয়াদী রোগ নিরাময়: হজমজনিত সমস্যা, প্রদাহজনিত রোগ এবং ক্রনিক সংক্রমণে হোমিওপ্যাথি প্রাকৃতিক সমাধান প্রদান করে।
  • নারীস্বাস্থ্যের জন্য: মাসিক সমস্যা, মেনোপজ সমস্যা, হরমোন সমস্যা ইত্যাদি সমস্যাতে হোমিওপ্যাথ আস্থার সাথে ব্যবহার করা যেতে পারে।

হোমিওপ্যাথির সীমাবদ্ধতা

অন্য সকল পদ্ধতির মতো হোমিওপ্যাথেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ- 
  • হোমিওপ্যাথ চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রোগ নিরাময় করে। কিন্ত তাৎক্ষণিক নিরাময় প্রয়োজন এমন রোগে এটি কার্যকরী নয়। 
  • হোমিওপ্যাথ জরুরী অপারেশনের প্রয়োজনে যথেষ্ট কার্যকরী নয়।
  • হোমিওপ্যাথ দুর্ঘটনা বা মারাত্মক ট্রমায় ব্যবহার উপযোগী নয়।

হোমিওপ্যাথ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হোমিওপ্যাথ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মধ্যে হোমিওপ্যাথ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের ভুল ধারণা রয়েছে, যা সঠিক নয়। অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির মতো, কিছু ক্ষেত্র ছাড়া, এটিও সমান কার্যকরী। তাই মানুষের মাঝে থাকা এই ভুল ধারণাগুলির নিরসন হওয়া জরুরী।

ভুল ধারনা-১ঃ হোমিওপ্যাথ ধীরে কাজ করে
অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে, হোমিওপ্যাথ দেরীতে কাজ শুরু করে। দেরীতে কাজ শুরু করে বলে অনেকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা গ্রহন করতে রাজী হন না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ ভেদে এর কার্যকারীতা শুরুর ভিন্নতা রয়েছে বটে। তবে অনেক জটিল রোগের ক্ষেত্রেও এটি দ্রুত কাজ শুরু করে।

ভুল ধারনা-২ঃ এটি স্রেফ প্লাসিবো
হোমিওপ্যাথ চিকিৎসার সরল গতি দেখে অনেকে ধারণা করেন এটি এক প্রকার প্লাসিবো। শুধু বিশ্বাসের উপর নিরাময় নির্ভরশীল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে এটি শুধুই প্লাসিবো নয়। বহু রোগীর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তা’ প্রমাণিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে যারা হোমিওপ্যাথের উপর একাগ্র থাকেন তাদের নিরাময়ের হার সন্তোষজনক।

ভুল ধারণা-৩ঃ জটিল রোগের ক্ষেত্রে সমাধান নেই
অনেকে ধারণা করেন হোমিওপ্যাথ জটিল রোগে কাজ করে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একদম ভুল ধারনা। যদি সময়মত জটিল রোগের চিকিৎসা নির্ভরতার সাথে শুরু করা যায় তবে তা নিরাময়ে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

ভুল ধারনা-৪ঃ নিজের ইচ্ছেমত ওষুধ খাওয়া যায়
হোমিওপ্যাথির সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি দেখে অনেকে মনে করেন রোগ নিরাময়ে নিজের ইচ্ছেমত ওষুধ খেতে কেনো বাধা নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নিয়ম মেনে ওষুধ খাওয়া হোমিওপ্যাথের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়ার সময পরিবর্তন, ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা যথার্থ নয়।

ভুল ধারণা-৫ঃ হোমিওপ্যাথি ওষুধে ষ্টেরয়েড আছে
অনেকে মনে করেন, হোমিওপ্যাথি ওষুধে ক্ষতিকর ষ্টেরয়েড আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, হোমিওপ্যাথি ওষুধে কোনো ষ্টেরয়েড নেই। এটি ভেষজ, প্রাণীজ ও খনিজ জাতীয় প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরী করা হয়। তাই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। 

হোমিওপ্যাথি বনাম আধুনিক চিকিৎসা

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনার এ’ পর্যায়ে সবার মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে কোন চিকিৎসা গ্রহন করব। হোমিওপ্যাথি না আধুনিক এলোপ্যাথি। নীচে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি।

বিষয় হোমিওপ্যাথি আধুনিক চিকিৎসা
মূলনীতি সমজাতীয় দ্বারা সমজাতীয় রোগ নিরাময় রোগ সৃষ্টিকারী কারণ ও উপসর্গ নিরাময়
ওয়ুধ উদ্ভিজ, প্রাণীজ ও খণিজ প্রাকৃতিক উপাদান হতে প্রস্তুতকৃত রাসায়নিক সংশ্লেষিত ওষুধ
ফোকাস রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, রোগ নয় রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়
বিজ্ঞান মতভেদ আছে, গবেষণা চলমান প্রমাণিত, সুপ্রতিষ্ঠিত
কখন কোনটি দীর্ঘস্থায়ী রোগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা জরুরী অবস্থায় জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা

হোমিওপ্যাথি কারা গ্রহন করতে পারবেন

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনার এ’ পর্যায়ে প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে কারা হোমিওপ্যাথ গ্রহন করতে পারবেন? এক কথায় যারা হোমিওপ্যাথির উপর বিশ্বাসী, নির্ভর করতে চান তারাই গ্রহন করতে পারবেন। তবে হ্যাঁ, জরুরী রোগীদের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ না করাই উত্তম। তাছাড়া দীর্ঘদিনের রোগে ভুগছেন তারা হোমিওপ্যাথ ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়ার বাস্তব  প্রমাণ রয়েছে। নবজাত শিশু, বয়স্ক, মহিলারা হোমিওপ্যাথি গ্রহন করতে পারেন। যারা কেমিক্যাল ওষুধ খেতে আগ্রহী নন, প্রাকৃতিক ওষুধ খেতে চান তারা হোমিওপ্যাথি গ্রহন করতে পারবেন।

হোমিওপ্যাথি গ্রহনের আগে করণীয়

হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে, বুঝে তবেই হোমিওপ্যাথি গ্রহন করা উচিত। কারণ, কোনো জিনিসের উপর যদি বিশ্বাস-ই না-থাকে তবে তার কার্যকারিতাও সঠিকভাবে উপলব্ধ হয় না। তাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে হোমিওপ্যাথি গ্রহন করতে হবে। নিয়মিত নিয়ম মেনে ওষুধ খাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। ধৈর্য্য ধরে ওষুধ খাবেন সে রকম ভাবে মনকে প্রস্তুত করতে হবে। দোদুল্যমানতা পরিহার করতে হবে। একবার এ’ ওষুধ তো আরেকবার আর এক ওষুধ এ’ রকম মানসিক অস্থিরতা পরিহার করে তবেই হোমিওপ্যাথ গ্রহন করতে হবে।

শেষ কথাঃ হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা 

এতক্ষণ হোমিওপ্যাথি কী? উপকারিতা, ব্যবহার ও ভুল ধারণা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আসলে হোমিওপ্যাথি একটি সহায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি, যা ডক্টর হানিম্যানের হাত ধরে জন্ম নিয়েছে। আর বর্তমান আধুনিক সময়ে বিশেষজ্ঞদের হাত ধার তা আধুনিক, যুক্তি নির্ভর ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই আর্টিকেলে হোমিওপ্যাথের মূলনীতি, সাধারণ ব্যবহার, প্রয়োগের ক্ষেত্র, উপকারিতা, সীমাবদ্ধতা, প্রচলিত ভুল ধারণা, কোন রোগে হোমিওপ্যাথ ব্যবহার করা যাবে, হোমিওপ্যাথি বনাম আধুনিকতা ইত্যাদি অনেক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 

হোমিওপ্যাথি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সব রোগের সমাধান না-করতে পারলেও কিছু সমস্যায় উপকার দিতে পারে। তবে সচেতনতা ও বাস্তব জ্ঞান ছাড়া হোমিওপ্যাথির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী এবং দায়িত্বশীলভাবে চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

নিশ্চয়ই এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনাদের মনে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারনা দিতে পেরেছি। আজ এখানেই শেষ করছি। আমাদের সাথে থাকুন। ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

বহুবিধ.কম-এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

Author Bio

Sanjib Kumar Roy
Engr. Sanjib Kumar Roy
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও বহুবিধ.কম এর এডমিন। তিনি অনলাইন ইনকাম, ব্লগিং, SEO ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। ৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সফল হতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।